কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে, জুম্মার নামাজ পড়তে গি‌য়ে ফিরলো লাশ‌ হ‌য়ে ছেলে মোস্তফার বাবা।
তা‌নিয়া ইসলাম প্রিয়া, মুন্সীগঞ্জ
গত ২৬-৭-২৪ তা‌রি‌খে শুক্রবার মোস্তফা ওর বাবার সঙ্গে জুমার নামাজ পড়তে ঢাকার রামপুরার ভাড়া বাড়ি থেকে বেড় হয়েছিল। ওর বাবা নামাজ শেষে বাড়িতে এসেছিল। ছেলেটা ওর বন্ধুদের সঙ্গে পাশের মসজিদে নামাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। ফোনে বলেছিল দুই মিনিট পরেই বাড়ি আসবে। ছেলে ঠিকই সেদিন বাড়িতে এসেছিলো,তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে।
কথাগুলো বলতে বলতে ডুকরে ডুকরে কাদছিলেন
কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের মধ্যখানে পড়ে গুলিতে নিহত মোস্তফা জামান ওরফে সমুদ্র (১৭) মা মাসুদা জামান।
মোস্তফা জামানের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকায়। তবে মোস্তফা তারা বাবা-মার সঙ্গে রাজধানীর রামপুরা এলাকায় থাকতেন।
এ বছর ঢাকার আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের ব্যবসা শাখা থেকে জিপিএ ৪ দশমিক ৯৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় সে। মোর্শেদুজ্জামান নামে জাপান প্রবাসী এক বড় ভাই রয়েছে তার।
বৃহস্পতিবার সিরাজদিখানে গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন মোস্তফার মা মাসুদা জামান এবং বাবা তাজল কাল।মধ্যপাড়া গ্রামেই পাশাপাশি নানা ও দাদার বাড়ি মোস্তফার।
এদিনেই বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে মধ্যপাড়া বাজারের সেতুর দক্ষিণপাশের মাটির সড়ক ধরে ৫ মিনিটি হাটলে মোস্তফাদের গ্রামের বাড়ি।
গাছ পালায় ঘেরা বাড়িটি শোকে স্তব্ধ হয়ে আছে। তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মোস্তফার বাবা-মায়ের ঘরের বাহিরে নিরব হয়ে বসে আছেন। পাশেই তাদের কয়েকজন স্বজন বসেছিলেন।
সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদক মোস্তফার বিষয়ে জানতে চাইলে কোন কথা বলতে তাঁরা রাজি হননি। তাদের চোখে-মুখে একদিকে আতঙ্ক অন্য দিকে বিরক্তির ছাপ দেখা যায়। এসময় তাঁরা বারবার বলছিলেন আমরা সরকারের পক্ষের মানুষ।  আমরা এ সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু বলবো না।
পরিস্থিতি কিছুটা সামলে নিয়ে মোস্তফার মা মাসুদা জামান  বলেন, বাবা-ছেলে এক সঙ্গে সেদিন নামাজে বেড়িয়ে ছিলো। বরাবরের মত ওর বাবা এক মসজিদে, পাশের আরেক মসজিদে এলাকার বন্ধুদের সঙ্গে জুমার নামাজ পড়েতে গিয়েছিলো মোস্তফা।
নামাজ শেষে ওর বাবা বাড়িতে চলে আসে। মোস্তফাকে সেদিন বেলা পৌনে তিনটার দিকে ফোন করে বাড়িতে আসতে বলেছিলাম। ও বলেছিল বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষে দু্ই মি‌নিট পর বাড়ি চলে আসবে।
ছেলে বাড়ি না ফেরায় সাড়ে তিনটার দিকে আবারো ফোন করি। সে সময় আরাফাত নামে এক ছেলে ফোন ধরে বললো মোস্তফা দূরে আছে কাজ করছে।
বিকেল চারটার দিকে আবারো ফোন করি, তখন আরাফাত জানায় মোস্তফার গুলি লেগেছে। মোস্তোফাকে রামপুরার ডেলটা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে গিয়ে ছেলের নিথর দেহ দেখি। সেখানকার চিকিৎসক বলেছিল মোস্তফা আর নেই মারা গেছে।
ছেলে মারা গেছে মানতে পারিনি। সেখান থেকে বেটার লাইফ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকও জানান আমার ছে‌লে মোস্তফা আমা‌দের মা‌ঝে নেই।
গোলাগুলির সময় কোথায়‌ থেকে একটি গুলি এসে মোস্তফার হাতে লাগে। হাত ভেধ করে সে গুলি পাজরে ঢুকে গিয়েছিলো। এতে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণে মোস্তফা মারা গেছে।
মাসুদা জামান আরো বলেন, আমার ছেলেটার যখন গুলি লাগে ও আরাফাত নামে ওই ছেলেকে বলেছিল মা কে একটা কল দিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে বলেন।
আমিতো আমার ছেলেকে আনতে গেলাম। জীবিত আনতে পারলাম না। ছেলের মৃত দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
ছেলে হারিয়েও যেন আতঙ্ক কাটছেনা মোস্তাফার বাবা তাজল কালের। ছেলেকে হারিয়েছেন, নতুন করে আর বিপদে পড়তে চান না তারা।
ছেলের লাশকেও আর কষ্ট দিতে চাননি তাঁরা। তাই ঘটনার দিন অনেকটা তড়িঘড়ি করেই মোস্তফার দাফনের কাজ শেষ করেছিলন তারা। ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়িতে লাশ এনে সে রাতেই স্থানীয় সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন আহমদ,উপজেলা চেয়ারম্যান আওলাদ হোসেন মৃধা এবং স্থানীয় প্রশাসনের ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে মোস্তফাকে তাদের পারিবারিক কবরস্তানে দাফন করেন।
বৃহস্পতিবার সংবাদ কর্মীর সঙ্গে কি কথা বলবেন, কতটুকু বলবেন এ ব্যাপারে উপজেলা চেয়ারম্যান আওলাদ হোসেন মৃধার সঙ্গে মুঠোফোনে বারবার পরামর্শ করছিলেন।
মোস্তাফার বাবা তাজল কাল বলেন, ছেলে ফিরে পাবো না। আমরা আর কোন ঝামেলায় পড়তে চাইনা। কারো বিরুদ্ধে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। কার গুলি ছেলের লেগেছে সেটাও জানি না।
সেদিনের বর্ণানা দিতে গিয়ে তাজল কাল বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সপ্তম শ্রেণিতে পড়তাম। সে সময় যুদ্ধ দেখিনি। তবে ঢাকার সদর ঘাটে ৮-১০ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ দেখেছিলাম। সয্য করতে না পেরে গ্রামের বাড়ি চলে এসেছিলাম।
গত শুক্রবার যুদ্ধ দেখেছি,  নিজের ছেলেসহ একসাথে হাসপাতালে  লাশের দীর্ঘ সারি। বাবা-মা স্বজনদের আহাজারি দেখেছি।
নিহত মোস্তফা সবার সঙ্গে খুব মিশুক ছিল। একেবারেই শান্ত প্রকৃতির ছেলে ছিল সে। কখনো কারো সঙ্গে মুখ কালো করে ও কথা বলতো না বলে জানান মোস্তফার প্রতিবেশী মামা আব্দুল মালেক।
আব্দুল মালেক জানান, যখনই মোস্তফারা প্রতি সপ্তাহেই গ্রামের বাড়িতে আসতো সবার সা‌থেই খুব ভা‌লো সম্পর্ক ছি‌লো। সর্ব শেষ গত ১৩ জুলাই বাড়ি থেকে ঢাকায় যায় ওরা।  যখন বাড়ি আসতো আমাদের সবার ঘরে ঘরে যেতো।
মামা, মামি বলে ডেকে ডেকে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখতো। সন্ধ্যার পরে নিজেই গ্রামের বাজার থেকে মুরগি কিনে আনতো। সেটিকে বারবিকিউ করে বাড়ির সবাইকে ডেকে নিজ হাতে খাওয়াতো।
মোস্তফার প্রতিবেশি এক মামি রিনা বেগম বলেন,ও বাড়ির সব ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করতো। আমরা যে ওর রক্তের কেউ না এটাও কখনো বুঝতে দিতোনা। এতটা ভালো ছেলে ছিলো মোস্তফ‌া।
অথচ সেদিন ঢাকায় কোনো আন্দোলনে না গি‌য়ে। জুম্মার নামাজ প‌রে  বাড়ি ফেরার পথে এই ছেলেটাকে গু‌লি ক‌রে মারা হলো।