লেখকঃ সাজ্জাদুর সিরাজ নিবিড়ঃ
শুভ পহেলা আষাঢ়। বাংলায় বর্ষা আসে প্রেম-ভালবাসার বার্তা নিয়ে। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে প্রকৃতি যখন ক্লান্ত, ঠিক তখন দরজায় কড়া নারে বর্ষা। প্রকৃতি ফিরে পায় যৌবন।
চারিদিকে তাকালেই চোখে পরে সবুজের সমারোহ। সবুজে তাকালেই আনমনা হয় মন। ভালবাসতে ইচ্ছে করে প্রকৃতিকে আর প্রিয়জনকে।
গ্রীষ্মের দাবদাহের ইতি টেনে বর্ষার বর্ষণ চৌচির হওয়া মাটিতে ফেরায় প্রাণ। তীব্র রোদের বিপরীতে আকাশে ভেসে বেড়ায় মেঘের ভেলা।
মানুষ খুঁজে পায় প্রশান্তি। বর্ষায় জীর্ণ প্রকৃতিতে আসে যৌবন। মৃতপ্রায় নদী, খাল ফুলে ফেঁপে ওঠে।
পাল তোলা নৌকায় নদী বক্ষে রূপকথার মত সৌন্দর্য ছড়ায়।
বর্ষা গ্রামের গৃহিণীদের জন্য নিয়ে আসে দৈব বার্তা। ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত গ্রামের বৌদের ক্লান্তিতে লাগাম টানে বর্ষা।
ব্যস্ত কৃষক স্বামীকে কাছে পেয়ে করে ভালবাসার গল্প। ধান ঘরে তোলা হাতগুলো সুনিপুণ ভাবে সেলাই করে নকশি কাঁথা।
একটা নকশি কাঁথার সাথে মিশে থাকে কত না বলা গল্প। কৃষক পাড়ার ভিন্ন চিত্র জেলে পাড়ায়। জেলে-জেলেনি একসাথে মাছ ধরার জাল বুনে।
জেলে পাড়ায় সুবাস ছড়ায় আলকাতরা। জেলেনি মনকে পাষাণ করে স্বামীকে মাছ ধরতে পাঠায় উত্তাল-যৌবনা নদীতে।

দুর্দশাগ্রস্থ-নিম্নবিত্ত জেলে পরিবার পেট ভরে খাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিছু কৃষক আলস্যকে বিদায় জানিয়ে ভেসাল আর চ্যাঁই নিয়ে নেমে পড়ে খালে-বিলে মাছ ধরতে।
কৃষি প্রধান বাংলাদেশের জমি উর্বর করতে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা বয়ে আনে পলি মাটি। শীতে সেই মাটিতে ফলে সোনার ফসল। মাছেরা প্রজনন ঘটায় নতুন পানিতে।
কৃষকের ধানে আর জেলেদের মাছে আমরা হয়ে উঠি পূর্ণ মাছে-ভাতে বাঙ্গালী।
শহরে বর্ষা আসে একটু ভিন্নভাবেই। ব্যস্ত নগরী কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়।
প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বের হয় না। প্রিয়জনকে কাছে পেতে বর্ষা যেন আশীর্বাদ। আধুনিক তরুণ-তরুণীরা চায়ের কাপে আড্ডা জমায়।
একটু উচ্চবিত্তরা কফিশপে। প্রবল বর্ষণে ঢাকায় বাতাস পূর্ণতা পায় খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজার ঘ্রাণে।
বর্ষার গর্জনে শহরের সকল শিশু ও তরুণেরা ছাদে অপেক্ষা করে বৃষ্টির জলে কাক ভেজা হতে। কিছু প্রেমিক যুগল শাড়ি-পাঞ্জাবি পরিধান করে স্নাত হয় মুষলধারায়।
ফুল ভালোবাসা, সৌন্দর্য ও পবিত্রার প্রতীক। বর্ষায় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বসুন্ধরা। খালে বিলে ফোটে জাতীয় ফুল শাপলা। এছাড়া কদম, কলমি ফুল, কচুরি ফুল, কেয়া ফুল ফোটে।
দিগন্ত খোলা মাঠে শাপলা এবং কচুরি ফুল চোখে নেশা ধরায়, মানুষ হারায় প্রকৃতির মাদকতায়। বর্ষার প্রথম দিনে প্রেমিক তারা ভালোবাসার মানুষকে কদম ফুল দিয়ে বর্ষাকে স্বাগত জানায়।
শাড়ি-পাঞ্জাবি পরিধান করে তারা ভিজে আবিরাম বর্ষণে, তাদের ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে গর্জে ওঠে আকাশ।
বৃষ্টি ভেজা হলে গায়ে যখন হিম ধরে, তারা নিজেদের উষ্ণ করে চুম্বনে। রবি ঠাকুর তাঁর গানে লিখেছেন- ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান’।
হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন,
“যদি মন কাঁদে
তুমি চলে এসো, চলে এসো
এক বরষায়…
এ মিনতি ধরণীর সকল প্রামিক যুগলের কাছে।
ভুলে বোঝার অবসান ঘটিয়ে, মন খারাপের অবসান ঘটিয়ে বর্ষায় প্রিয়জনকে মানুষ কাছে চায়।
বর্ষা মানুষের মনে প্রেম জাগায়। কবি সাহিত্যিকদের কাছে বর্ষা প্রাধান্য পেয়েছে সবসময়।
বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব কবি বর্ষা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরার বর্ষা নিয়ে রচিত গানের সংখ্যা ১২০ টি।
বর্ষা আমাদের উদাস করে তাইতো কবি লিখেছেন,
“আজি ঝরোঝরো মুখর বাদর দিনে
জানিনে, জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।”
আষাঢ়-শ্রাবণের অবিরাম ধারায় ধুয়ে যাক আমাদের গ্লানি। নবো উদ্যমে ভাল থাকি সবাই।