মুন্সিগঞ্জে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় চলছে মাটি কেটে বিক্রির মহোৎসব।
মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি:
মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীতে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায়, তালতলা-ডহরী খালের দুই পাড়ের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে, তবে এর সাথে জড়িত এই চক্রের সদস্যদের দাবি প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে এমন নৈরাজ্য। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন ভিন্ন কথা।
শনিবার সকালে উপজেলার আউটশাহী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ভাঙ্গন কবলিত কাইচাইল এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, গেলো বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই ভাঙ্গন দেখা দেয়ায় বিলীন হচ্ছে সেখানকার বাসিন্দাদের বসতবাড়ির ভিটেমাটি সহ বিভিন্ন গাছপালা ও কৃষিজমি।
চলতি বছর তালতলা-ডহরী খালের ভাঙ্গনে প্রায় ১৫ টির ও বেশি বসতবাড়ির ভিটেমাটি ও কৃষিজমির মাটি ভেঙে বিলীন হয়েছে আর ভাঙ্গন ঝুঁকিতে রয়েছে ইউনিয়ন টির বেশ কয়েকটি গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার।

অন্যদিকে ভাঙ্গন কবলিত এলাকার দুই পাড়ের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি যেন, মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভাঙ্গন ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ তালতলা ডহরী খালের বিভিন্ন পয়েন্টে দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করেছে একটি প্রভাবশালী মহল ফলে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালুবোঝাই বল্কহেড চলাচলের কারণে ঘুর্ণয়মান স্রোতের প্রভাবে বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা। ফলে বসতভিটা রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন অনেকেই।
মনির হোসেন নামের ভাঙ্গন কবলিত একজন ক্ষতিগ্রস্থ জানান, তালতলা-ডহরী খালে অবৈধ বাল্কহেড চলাচলের বিষয়ে একাধিকবার লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানিয়েছেন তবুও এসব বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ফলে নতুন করে দেখা দিয়েছে ভাঙ্গন।

এতে ক্ষতিগ্রস্থ, ইমরান খাঁন,মতালেব বেপারী,শাহ আলম,আলমগীর,জসিম বেপারী,আবুতাহের বেপারী, সানাউল্লাহ বেপারী বারেক শেখ, খালেক শেখ, আব্দুল মালেক শেখ,হাসমত আলী বেপারী ও জাহাঙ্গীর খান সহ আরও বেশ কয়েকজন জানায়,চলতি অক্টোবর মাসে শুরু থেকেই বেড়েছে ভাঙনের তীব্রতা প্রতিদিনই একটু একটু করে বিলীন হচ্ছে বিভিন্ন গাছপালা ও বসতবাড়ি তবুও ভাঙ্গন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা।
এছাড়াও ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় তালতলা ডহরী খালের দুই পাড়ের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির ব্যাপারে দীর্ঘ দিন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।
সরোজমিনে আরও দেখা যায়, ভাঙ্গন কবলিত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে মাটি কেটে স্টিলের ইঞ্জিন চালিত ট্রলার তুলছেন শ্রমিকরা, তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় প্রতিটি ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া মাটি বিক্রি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার জাজিরা এলাকার বিভিন্ন ইটভাটায়।
মাটি কাটার সাথে জড়িত এই চক্রের অন্যতম সদস্য জাহাঙ্গীর শেখ এর সাথে কথা হলে, তিনি বলেন প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে এমন কার্যক্রম। এছাড়াও তার দাবি ভাঙ্গন কবলিত এলাকা থেকে মাটি কেটে সরিয়ে নিয়ে গেলে কমে আসবে ভাঙ্গনের তীব্রতা।
তবে মাটি কাটার প্রভাবে বাড়ছে ভাঙ্গনের ঝুঁকি অভিযোগ আশেপাশের বাসিন্দাদের। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে ভাঙ্গন কবলিত বিভিন্ন মানুষের বসত বাড়ির জমি জোড় করে কেটে নিচ্ছে এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এমনই এক ভুক্তভোগী মনির হোসেন জানান,মাটি কাটা চক্রের সদস্য তার চাচাতো ভাই, জাহাঙ্গীর শেখ ও আলমগীর শেখ গভীর রাত থেকে মাটি কেটে ট্রলারে করে বিক্রি করে দিচ্ছেন বিভিন্ন ইটভাটায় এ বিষয়ে বাঁধা দিতে গেলে বিভিন্নভাবে মারধরের হুমকি দেয়া হচ্ছে তাকে আর তার স্ত্রী রাশিদা বেগমের অভিযোগ নানা ভাবে অত্যাচার করে জোরপূর্বক তাদের বসতবাড়ির মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে।
শুধু তিনিই নয়, ইলিয়াস হোসেন,বাদল হোসেন,ইমন হাওলাদার,সোহেল হাওলাদার, ও গুলিনূর বেগম,আকলিমা বেগম সহ আরও বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, গভীর রাতের অন্ধকারে শুরু হয় মাটি কাটার কাজ চলে সকাল ৯ টা পর্যন্ত। গত দুই সপ্তাহের তীব্র ভাঙ্গনের কবলে একদিকে যেমন বিলীন হচ্ছে ভিটেমাটির জমি অন্যদিকে মাটি কাটার কারণে ভাঙ্গন ঝুঁকি বেড়েছে ইউনিয়নটির প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কমপক্ষে দেড় শতাধিক বাড়িঘর ও কয়েক একর কৃষি জমির।
আউটশাহী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ সেকান্দর বেপারী জানান, তালতলা ডহরী খালের ভাঙ্গনের বিষয়ে তিনি অবহিত থাকলেও, কোন খোঁজ রাখেননি মাটি কাটার ব্যাপারে, তবে অন্যায় ভাবে আইন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে,কেউ মাটি কাটলে, প্রশাসনের প্রতি ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
তবে এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে শুরুতে কিছুই জানেন না বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, মুঃ রাশেদুজ্জামান, তিনি বলেন ভাঙ্গনে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে একটি লিখিত আবেদন পেলেও, এখনো মাটি কাটার বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাননি তিনি।
তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে ঘটনার সত্যতা পাওয়া মাটিকাটা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত এই চক্রের অন্যতম সদস্য জাহাঙ্গীর শেখ কে, শনিবার সকাল সাড়ে ১১ টায় অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগের প্রেক্ষিতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মু. রাশেদুজ্জামানের নির্দেশে ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রেজওয়ানা আফরিন।
এ সময় অভিযান পরিচালনাকালে অবৈধভাবে শ্রমিকদের সহায়তায় খালের দুই পাড়ের মাটি কেটে ইট ভাটায় বিক্রির সত্যতা পাওয়ায়। ভ্রাম্যমান আদালত তাকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর আওতায় ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ না করার জন্য তার কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করা হয়।